"খাল কেটে কুমির আনা "
- ফেরদৌসী পারভিন | Ferdawsi Pervin
- Mar 20
- 3 min read
" খাল কেটে কুমির আনা "-----
বাংলা ভাষায় এটি একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ। প্রবাদ তৈরি হয় যুগে যুগে মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে । যখন কোন ঘটনার ফলাফল একইরকম হতে থাকে অর্থাৎ পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে তখন মানুষ ধরেই নেয় যে ,এই করলে এই হবে।
কথিত আছে যে , পানির প্রয়োজন মেটানোর জন্য খাল খনন করে নদী থেকে খালের মাধ্যমে পানি প্রবাহিত করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য নি:সন্দহে উত্তম। পানি খালের মধ্যে দিয়ে যাবে। সেই পানি ব্যবহার করে কৃষক দুপাশে খেত খামার ফসলে সবুজ শ্যামলে ভরে তুলবে । আলপথে কৃষাণী ভাত নিয়ে যাবে মাঠে। এইরকম চিত্রকল্প কল্পনা যেকোন মানুষ করতেই পারে। কর্তাব্যক্তিরা খালকাটার পরিকল্পনা নিতেই পারেন এবং তা বাস্তবায়নও করতে পারেন।
কিন্তু নদীর পানির সাথে খালে কুমির ঢুকে পড়তে পারে। কুমির সুযোগ বুঝে কৃষককে গিলে ফেলতেও পারে।
আরো একটি গল্প আছে যা বাস্তবে আমরা অহরহ দেখতে পাই।
এক ব্যাক্তি , গৃহহীন এক ব্যাক্তিকে তার নিজের বাড়ির পাশে নিজের জমিতে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিল। দিন ,মাস , বছর গড়িয়ে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। ক্রমেই সেই আশ্রিত ব্যাক্তি শক্তিশালী হয়ে উঠলো এবং জমির মূল মালিক আশ্রয়দাতাকে অবজ্ঞা করতে লাগলো।
আরো কিছুদিন পর আশ্রিত ব্যাক্তি ,বাড়িঘর জমি সবকিছু তার নিজের বলে দাবি করলো। যিনি প্রকৃত মালিক তিনি পড়লেন মহা বিপদে। তিনি ছেলেকে ডেকে বললো , বাবা মহাবিপদ। এই লোকতো অহন কইতাছে যে ,বাড়ি ,জমি সব তার। আমরাগো নাহি হেই থাকপার জায়গা দিছে। এখন হেই বাটপাররে কিভাবে বাইর করন যায় একখান বুদ্ধি দে দেহি।
ছেলে বাপের কথা শুনে উত্তর দেয় , উপকার করতে গিয়া আপনে "খাল কাইটা কুমির " আনছেন অহন আর কাইন্দা লাভ নাই। নিজের বাড়িঘর কেমনে রক্ষা করন যায় হেইডা ভাবেন। ওই জায়গা কুমির গিল্লা ফেলছে অহন আর তার প্যাট থাইকা বাইর করা যাইবোনা।
এই ছিল গল্পটা। এই গল্পের সাথে আমাদের সকলেরই প্রায় পরিচয় আছে কমবেশি।
আমি তখন কলেজে পড়ি। আমার সামনে তখন হিরো শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। কালো চশমা ,সাদা টিশার্ট ,মাথায় ক্যাপ। কোদাল হাতে খাল কাটছেন। এই ছবি বাংলাদেশে ওই সময়ের সকলের মনে জ্বলজ্বল করে। তিনি খালকাটা কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন এবং তা সফল হয়েছিল। তিনি দেশে ,বিদেশে প্রসংশিত হয়েছিলেন ।
এরপর অনেক বছর গত হয়েছে। পদ্মা ,মেঘনা ,যমুনা ব্রম্মপুত্রে অনেক পানি গড়িয়েছে সেই সাথে তাদের বুক ভরাট হয়ে বিশাল বিশাল চর পড়েছে। উজানের ঢলে প্রতিবছর এদেশে কমবেশি প্লাবিত হয়। শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে উত্তরাঞ্চল মরুভূমি হবার উপক্রম। এমতাবস্থায় বড় নদী গুলোর ড্রেজিং ব্যবস্থা নেয়া হয়নি আর হলেও সেগুলো কিভাবে হয়েছে তা বলতে গেলে দীর্ঘ হয়ে যাবে।
সিকস্তি ও পয়স্তির স্শিকার নদী পাড়ের মানুষ। একজীবনে তাদের কতবার ঘরবাড়ি স্থানান্তর করতে হয় সেটা শুধু তারাই জানে। চোখের সামনে সবকিছু নদী গিলে খেলে এই মানুষগুলোর বুকেও চর জাগে। ধু ধু বালির রুক্ষ চর। ছোট্ট শিশুটি সেই রুক্ষতা নিয়ে বড় হয়। সুখী মানুষেরা তাদের চইরা মানুষ এবং বদরাগী বলেই পরিচিত করে। কিন্তু তাদের বুকের জমিনে কেন আবেগের সবুজ গজায়না তা ভেবে দেখেনা।
যাইহোক ,আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বাবার চিন্তাকে ধারণ করে খালকাটা কর্মসূচী নিয়েছেন এবং নিজে খনন কাজে অংশগ্রহণ করে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন। এই কর্মসূচি নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই যদিও বলা হচ্ছে অনেক বেশি বাজেটে , মুছে যাওয়া খাল কাটার প্রয়োজন আছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি এব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই তাই কিছু বলতে চাইছিনা । বরং আমি শুধু ঢাকার ভিতরে এবং পাশের এলাকার নদী ও লেক নিয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাইছি। যারা উত্তরা থাকেন তারা সবাই জানেন কি চমৎকার একটি লেক উত্তরায় আছে। যদিও তাকে এখন চমৎকার বলা যায়না । শুনেছি আগে নাকি নৌকো দিয়ে লেক পারাপার হতো। এখন শুধু তা ইতিহাসের পাতায়। লেক ভরাট হয়ে জীর্ণশীর্ণ হয়ে গেছে। তলানিতে নোংরা পানি। দূর্গন্ধে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যায়না। মশা মহা আনন্দে বংশ বৃদ্ধি করে চলেছে। যদি এই লেক খনন করে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় তাহলে পরিবেশ রক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে। একইভাবে ধানমণ্ডি লেক ,গুলশান লেক , রমনার লেক। এছাড়া তুরাগ নদীকে চোখের সামনে দেখলাম ভরাট হয়ে ঘরবাড়ি ,প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে। বালু নদী ,বুড়িগঙ্গা তো বুড়ী হয়ে গেছে অনেক আগেই। পানির রং দেখলে কষ্ট হয়।
ছোট্ট করে যাদের কথা বললাম এরকম নদী , খাল প্রতিটি জেলায় আছে এবং তা দখল করে ঘরবাড়ি ,প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর বন্যার প্রধান কারণ নদী খাল ভরাট হয়ে যাওয়া । তারা আর অথৈ পানি বুকে ধারণ করতে পারেনা।
নদীর দিকে তাকালে কষ্ট হয়। নদীর কষ্টের প্রভাব পড়ছে প্রকৃতিতে। একদিন তারা মরে যাবে। তাদের নাম থাকবে শুধু ভূগোল বইয়ের পাতায়। ভবিষ্যতের মানুষেরা নদী কি জানতে চাইবে?
তাই বলি কি নতুন খাল না কেটে বরং পুরনোগুলো আগে কেটে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করে খাল ,নদীকে নি:শ্বাস ফেলতে দেয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না তা ভেবে দেখা উচিত। তারপর যদি কাটার দরকার পরে তখন কাটা যাবে। নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থায় নতুন খালকাটা কতটুকু যৌক্তিক তা ভেবে দেখা দরকার । নাহলে শুধু অর্থের অপচয় হবে বলেই আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি বলে ।
খাল কেটে কুমির আনার ব্যবস্থা করার বুদ্ধি দেবার মতো লোকের অভাব আমাদের দেশে নাই বলেই ধারণা । ভালো করতে যেয়ে যেন আমরা ক্ষতি না করি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় যা প্রাসঙ্গিক ছিলো এখন তা নাও থাকতে পারে। জলবায়ু , জনসংখ্যা ইত্যাদির পরিবর্তন হয়েছে। প্রায় অর্ধশতক আগের প্রয়োজন আর এখনকার প্রয়োজনে ভিন্নতা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। হুজুগে সবকিছু করা ঠিক নয়। তাহলে ওই "খাল কেটে কুমির আনার "ব্যবস্থা হবে বলেই মনে করি।
ফেরদৌসী পারভিন
কবি ও ক্রিটিক
২০/৩/২০২৬
উত্তরা।

Comments