কানা আর কতবার হাইকোর্ট দেখবে ?
- ফেরদৌসী পারভিন | Ferdawsi Pervin
- Mar 17
- 3 min read
বাংলাদেশে একটা কথা প্রচলিত আছে যে , " কানাকে হাইকোর্ট দেখানো " এই কথাটির খুব সহজ অর্থ হচ্ছে , যে চোখে দ্যাখেনা তাকে যেটা প্রকৃত জিনিস বা স্থান নয় তাকে যেকোন স্থান বা জিনিস দেখিয়ে বলা , এটাই সেই স্থান বা জিনিস। অর্থাৎ যিনি চোখে দেখেননা তাকে বাংলা একাডেমির সামনে দাঁড়িয়ে বলা , তোমার সামনে হাইকোর্ট বুঝতে পেরেছো । যাকে বলা হলো তিনি সরল বিশ্বাসে ভেবে নিলো তার সামনেই হাইকোর্ট। আর যিনি মিথ্যে বললেন ,তিনি তাঁর বাকপটুতায় নিজেই মুগ্ধ হয়ে ভাবলেন যাক , বড় ধরনের ঠকানো গিয়েছে। আমরা কি হাইকোর্ট দেখছি ??
বর্তমান সরকারের অনেকেই বলছেন , আবেগ দিয়ে দেশ চলেনা। কিন্তু মুশকিল হয়েছে এখানেই। বাঙালি খুবই আবেগপ্রবণ জাতি। প্রয়োজনে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে ,বিপদের কথা চিন্তা না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ৭১ এর মুক্তি যুদ্ধে এবং ২৪ এর গণ আন্দোলনে। যার ফলশ্রুতিতে বড় মানুষেরা নানান কথা বলতে পারছেন বা হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন।
আসলে মানুষের চরিত্র গঠন হয় সেই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ ,প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ নদী মাত্রিক দেশ। ৬ ঋতুর এই দেশ কোমল কঠিনে জড়াজড়ি করে বেঁচে আছে যুগ যুগ ধরে। পলিতে প্লাবিত নরম কাদামাটির পাশাপাশি রুক্ষ চর মানুষের চরিত্র গঠন করে এই দেশে । নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া আবেগপ্রবণ করে তোলে এই বদ্বীপ অঞ্চলের অধিবাসীদের। তাই যারা আবেগের কথা বলছেন তাঁরা নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করছেন।
সংবিধান সংশোধন করার জন্যই হাঁ / না ভোটের ব্যবস্থা হয়েছিল। এবং মাননীয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন সেটা খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। এই দেশের প্রায় ৭০ % ভোটার হাঁ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু যখন সংশোধনের প্রশ্ন আসলো তখন শপথ নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারি দল নানান বাহানা দেখিয়ে শপথ নেননি এখন পর্যন্ত । তাঁরা বলছেন সংবিধানের বাইরে কিছু করা যাবেনা । ভালো কথা। আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু বিশেষ ধরনের একটি সরকারের অধীনে ভোটে অংশগ্রহণ করে আজ তারা সরকার গঠন করেছেন। আর করেই সেই সরকার ব্যবস্থাকে বেমালুম অস্বীকার করছেন । কিন্ত কেন? যদি বিশেষ সরকারের ভোট যদি বৈধ হয় তাহলে সংস্কারের দলিল বৈধ। আর তা নাহলে ভোট ,সরকার সব অবৈধ। যাঁরা এসব বলছেন তারাও অবৈধ হয়ে যাবেন । আর যে সংস্কার গুলোর কথা বলা হয়েছে তার প্রত্যেকটি গণতন্ত্র এবং গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার কথা বলে। তাহলে সরকারের আপত্তির জায়গা কোথায় ?
যে আবেগের কথা বলা হচ্ছে তার প্রতি আমাদের সবার সম্মান থাকা দরকার । এই আবেগ ছিলো বলেই ক্ষমতাধর মানুষেরা দেশের মাটিতে ফিরতে পেরেছেন। কিশোর ,যুবক ,নারী ,পুরুষ গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল আবেগ ছিলো বলেই । তারা জানতো তাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবেনা তবুও গুলির সামনে দাঁড়িয়েছে। তারা জানতো একদল গেলে আরেকদল এসে ক্ষমতার মসনদে বসবে। জানা স্বত্তেও স্কুলের ছেলে মেয়েরা রাস্তায় নেমেছে জীবন দিয়েছে। অথচ আপনারা ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার সাথে সাথে চোখ উলটে ফেলছেন। এদেশের মানুষ বি এন পির কাছে এটা আশা করেনি। আপনারা বলা শুরু করেছেন ৪৭ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। আপনারাদের মেমোরি এতো দুর্বল তা জানা ছিলনা।
অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন গণভোটের বিষয় আদালতের মাধ্যমে ফয়সালা হবে। আমি কম বুঝি তবে এটা বুঝি গণমানুষের রায়ই আদালতের রায়। আদালত গণমানুষের জন্য। আইনমন্ত্রী মহোদয় বিশেষ সরকারের এর্টনি জেনারেল ছিলেন। তিনি আইনবিশারদ। তিনিও বলছেন ,অনেককিছু । সাধারণ মানুষ আইন তেমন ভাবে বোঝেনা । কিন্তু প্রতারণা ঠিক বুঝতে পারে। এটুকু নিশ্চয়ই বুঝতে পারে কেন তারা হাঁ ভোট দিয়েছে । তারা এটুকু উপলব্ধি করতে পারে কোথায় তাদের বঞ্চনা ?
আসলে আমরা বড় মানুষেরা কি দিয়ে তৈরি সেটা গবেষণার বিষয় হতে পারে।
একটা প্রবাদ মনে পড়ছে এই মূর্হতে । সেটা হচ্ছে " গাঙ পার। হলে মাঝি শালা "। অর্থ , কার্যসিদ্ধি হলে উপকারীর উপকার ভুলে যাওয়া । ধরুন কোন ব্যাক্তি বিশেষ ,নদী পাড়ে বসে থেকে যখন ওপারে যেতে পারেনা। তখন নৌকার মাঝিকে মিষ্টি কথা বলে নদী পার করে দিতে বলে। মাঝি বিপদ দেখে যখন ব্যাক্তিটিকে নদী পার করে দিয়ে কিছু চাইলে নদীর ওপারে যাওয়া ব্যাক্তিটি বিরক্ত হয়। বিপদমুক্ত হয়ে সেই ব্যাক্তিই মাঝিকে গালি দেয় ,শালার মাঝি বলে।
সে যাইহোক। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব খারাপ। রেপের ঘটনা বেড়েছে। ১৫ /৩ /,২০২৬ তারিখ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং উত্তরায় দীর্ঘসময় ধরে ভাঙচুর চলেছে। এই দুটি ঘটনা কয়েকঘন্টা আগের বলে উল্লেখ করলাম।
যে ঐক্যমতে এসে সবাই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলো সব দল , তা কোন তাল বাহানা না করে সরকার দ্রুতই বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেই আশা করছি। জুলাই যোদ্ধাদের শরীরের কালশিটে মুছে গেলেও মনে কিন্তু রয়ে গেছে। স্বজনহারা এবং অঙ্গহীনদের কোনকিছুই কিন্তু মুছবে না মোছে না। তারা কবর থেকেও দেখছে যে ক্ষমতায় বসে সবকিছু অস্বীকার করা হচ্ছে ক্ষমতার ক্রিম আগের মতো চেটে খাওয়া খুব সহজ হবেনা। ৯০ আর ২৪ কিন্তু আলাদা।
এক শ্রেণির দালালের ভাষণ শোনা যাচ্ছে। বিপদের সময় এদের অধিকাংশকেই দেখা যায়নি। এখন টংকার ঝনঝনানি শুনে তাদের নিত্য নতুন ব্যাখ্যা তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। কিছু লোকের চরিত্রই এমনই । হালুয়া রুটির ভাগের ব্যবস্থা করে ফ্যালে তারা । কিন্তু জনগণের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নাই। তারা চায় ফলাফল। যা তারা হাঁ ভোটের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে।
আর যদি আমাদের গন্ডারের চামড়া হয় তাহলে বলার কিছু নাই । আবেগপ্রবণ জাতিতো ভুলেও যায় ,আবার জ্বলেও ওঠে।
একটি গল্পের লাইন বলি " হে মা কালী তুমি কি ঠাট্টাও বোঝনা "। আমার ধারণা অনেকেই জানেন গল্পটা। পরের কোন লেখায় বলা যাবে।
ফেরদৌসী পারভিন
কবি ও ক্রিটিক
১৭/৩/২০২৬
উত্তরা



Comments