top of page

একলা পথে

একলা পথে ---

দেখতে দেখতে অনেকগুলি দিন পার হয়ে গেল । দুটো সকাল কি এক ? নাকি বদলেছে তার দিগন্তরেখায় অনেকখানি । সেইদিন ভেসে এলো স্মৃতির খেরোখাতা নিয়ে । আমি পাতা উল্টে গেলাম।
প্রতিটি ছবি প্রকৃতির রঙে বিভোর ।
অন্ধকার মুছতে শুরু করেছে আকাশের প্রান্তরেখায় ।
গায়ে আলোর রেখা ফুটতে শুরু করেছে । আলো মানেই জীবন , আলো মানেই আরো কিছু সম্ভাবনা , আরো কিছু স্বপ্ন ,আরো কিছু আশা । সারারাত দুই সিটে রাজকীয় ভাবে একপ্রকার শুয়েই এস পৌঁছুলাম পাহাড়ি এক জনপদে। হামলে পড়েছিলো একরাশ বুনো গন্ধ । শুধু যে গন্ধটা পেতে চেয়েছিলাম তা পেলাম না ভোরের লাজ। আজ থেকে অনেক বছর আগে যখন প্রথম পাহাড় দেখেছিলাম তখনই প্রেমে পড়েছিলাম এই মূকবধির অহংকারের । কি এক একাকীকিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাথা উঁচু করে । এই প্রেম বেড়েছে কঠিনে কমলে । যখনি সম্ভব হয়েছে ছুটে গেছি পাহাড়ের কাছে দেশে, বিদেশে । দেশের বাইরে বেড়াতে গেলেই পাহাড়েই বেশী যাওয়া হয়েছে । দেশে পার্বত্যাঞ্চলের তিনটি জেলাতেই বার বার যাই ।
একটি অধ্যায় শেষ করে এসেছি
নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করতে । একটি লেখার বিষয়ও মাথায় নিয়ে আসা ।
যাইহোক ভোর মেখে নেমে পড়লাম বুনোগন্ধ মাখা এই শহরে । এখনো জাগেনি শহর । সবে আড়মোড়া ভাঙছে । শীত যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়েছে আদিমতার অন্ধকারে । কুয়াশার হালকা আস্তিনে ঢেকে আছে গাছপালা । ব্যাগপত্র গুছিয়ে নেমে পড়লাম। খুব পরিচিত না হলেও একেবারে অচেনা নয় । বছর তিনেক আগে একবার এসেছিলাম । পরিবর্তন চোখে পড়লো না । কিংবা পরিবর্তন ঘটেছে ভেতরে ভেতরে কিন্তু আমার চোখে পড়ছে না । কথিত টমটম নিয়ে গাইরিংয়ের দিকে চললাম । আগে থেকেই বুকিং দেয়া ছিল । মালিকের সাথে আমার পরিচয় আছে ।
প্রবল শব্দে এসে দাঁড়ালাম হোটেল চত্তরে । এখানেও জীবন শুরু হয়নি । আমাদের দিকে ঘোড়ার গাড়িকে টমটম বলে , এখানে অশ্বশক্তিতে চলে টমটম । রূপান্তরের আর এক রূপ ।

খুব টায়ার্ড লাগছিল । সকালে এক জায়গায় যাবার কথা আছে । বেশ বড় রুম দুইপাশে দুটি খাট । ব্যবস্থা খারাপ নয় । যদিও এরা এখনো প্রফেশনাল হতে পারেনি পুরোপুরি । কাজ চলে যায় । আমার বরাবরই ভালো হোটেলে থাকতে ভালো লাগে । কি নিশ্চিন্তি সময় কাটে । উল্টো পাল্টা করে বেড়িয়ে যাও কিন্তু ফিরে এসে ঠিক টিপটপ পেয়ে যাবে সবকিছু । আরাম করে কাটানো সময় , প্রকৃতি উপভোগ করো ।

বারান্দা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালাম । জোরে অক্সিজেন টেনে নিলাম বুক ভরে । বাতাসে ফাগুনের গন্ধ । এবার ফাগুনকে সামনে রেখে এসেছি । এইসময়ে 2013 সালে এপথে রাংগামাটি গিয়েছিলাম। তখন পথের বাঁকে বাঁকে পলাশের হোলি দেখেছি যা স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে । কলিগরা সাথে ছিল অফিসিয়াল কাজে এসেছিলাম । এবার এসেছি একা । আমার কাছে মনে হয় প্রকৃতি দেখতে হলে একা। চুপচাপ আকন্ঠ পান করা । আমার জানা ছিল না পলাশ এখন আর তেমন করে দোল খেলে না। পথের প্রান্তরেখায় দাঁড়িয়ে বিলোল কটাক্ষ হানে না ।
বিছানায় কিছুটা সময় কাটিয়ে প্রস্তুত হলাম মানিকছড়ি যাবার জন্য । একটা সি এন জি ঠিক করে দিয়েছে হোটেল কতৃপক্ষ । সেটাতেই যাবো। আমার পথপ্রদর্শকের আচরণ অন্য রকম মনে হলো । তাকে আমি চিনি কিন্তু খুব অচেনা মনে হলো । রিসিভশন থেকে জানালো আমি যেখানে যেতে চাইবো সেখানেই নিয়ে যাবে । মালিক বলে দিয়েছে ।
যাবার জন্য নিচে নেমে আসতেই সি এন জিতে উঠে চলে গেলাম মানিকছড়ি । রাজবাড়ি দেখে ভালো লাগলো যদিও সি এন জির শব্দটা নিতে পারছিলাম না । ফিরে এলাম পথের পাশে হোটেলে পাহাড়ি খাবার খেয়ে । তেলবিহীন সবজি ভালো লাগলো বেশ।
বিকেলে বিকাশ দা তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে ডেকেছেন আমার সম্মানে । তাদের সাথে আলাপ হলো সাথে প্রচুর খাওয়া দাওয়া । বিকাশ দা এই হোটেলের মালিক নন শুধু বিশিষ্ট ব্যবসায়ীও । তিনি পরদিন আদিবাসী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। প্রকাশিত
আমার লেখা বইগুলো উপহার দিলাম ।
বুঝতে পারছিলাম,জীবন অন্য কোথাও জীবনের গল্প লিখছে । যে সব জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল পথপ্রদর্শক যেতে পারবে না জানালো । আমি ঠিক করলাম একা মুভ করবো । কালো মসৃণ পথের মোড়ে মোড়ে ঝরা পাতার কান্না দেখে দুটো দিন কেটে গেল। পাখির চোখে দেখে নিলাম অনেক অদেখাকে । ফেরার টিকেট কনর্ফাম করলাম । একদিন একটি পলাশের লাজুক হাসি চোখে পড়লো । সেগুনের পাতা শুন্য নিরাভরণ চেহারা বুকের মধ্যে হাহাকার হয়ে অনেক কথা বলছে । সব বুঝতে পারছি । বসন্ত দেখতে এসেছি । শীত চলে যাচ্ছে একটি বছরের জন্য আর হয়তো দেখা হবে না । নতুন ও পুরাতনের পালাবদলের সাক্ষী হতে চেয়েছিলাম । কিন্তু পাহাড়ে বসন্তসখার দেখা পেলাম না । দরিদ্র পাহাড়ের জন মানুষের যাপিত জীবনে বসন্ত কি করে দ্বার খোলে জানা হলো না । যেদিকে তাকাই শুধু শুনি বসন্তের বিলাপ । এমন বসন্ত আমি চাইনি । চেয়েছিলাম মারমা নারীর চুলে বসন্তের মহাকাব্য লিখতে । পলাশের আলোয় আলোকিত হবে ভেতর বাহির । ত্রিপুরা কন্যের থামিতে দোলা দিয়ে যাবে মাতাল সমীরণ । গন্ধে মাতাল হবে পথভোলা পথিক ক্ষণিকের জন্য হলেও । পাকদণ্ডি বেয়ে উঠতে উঠতে কোন একটা অজানা ফুলের গন্ধ পেলাম । আমের বোল দেখতে পেলাম ছোট একটা গাছে । একেবারে ঝেঁপে এসেছে । মায়াবিনী লেকে সূর্য আবির গুলে দিলো । দূর পাহাড়ে ছায়া দীর্ধতর হচ্ছে । দীর্ঘতর হচ্ছে ব্যাবধান । ভেতরের পরিবর্তন কি আচমকা স্পষ্ট হচ্ছে ?
মহাকালের গর্ভে হারাচ্ছে একটা ঋতু , কিছু স্মৃতি ,কিছু গল্প । বাতাসে অবিশ্বাসের সুর শুনতে পাচ্ছিলাম । প্রকৃতি কি মানুষের মতো প্রতারণা করছে ? কেন অপেক্ষায় নাই আমার মতো ভালোবাসার মানুষের জন্য । কেন একটুখানি বসন্তের রঙ ছুঁয়ে দিল না ! কি বা ক্ষতি ছিল তাতে ? গভীরতম অন্ধকারে নেমে পড়লাম পথে । হেড লাইটের আলোয় শাল সেগুনের জড়াজড়ির গল্প চোখে পড়লো । বুনো গন্ধমাখা রাত টেনে নিল পথের সীমানায় ।
কিছু গল্প কি কখনওই লেখা হয় না ? গল্পে থেকে যায় চোরাপথ । যে পথে হাতছানি দেয় পাহাড়কে অন্য কোন মেঘবালিকার আলিঙন ।

11 . 2 . 2026

শুভ সকাল।

©2024-26 | MKD

bottom of page